অনিন্দ্যবাংলা : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নে দুইযুগেও যেখানে একজন আনসারের ব্যবস্থা ছিলো না, সেখানে বর্তমান পরিচালক বিগ্রেডিয়ার নাছির উদ্দীন মাত্র ২ বছরে ৫০ জন আনসারের ব্যবস্থা করে চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা সেবারমান বৃদ্ধির ফলে হাসপাতালে আগত রোগী ও অভিভাবকদের নিরাপত্তার স্বার্থে আরো ১০০ জন আনসারের বিশেষ প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর মাসে হাসপাতালের পক্ষ থেকে ১০০ জন আনসারের জন্য আবেদন করলে মাত্র ৩০জন আনসারের ব্যবস্থা হয়, ফলে হাসপাতালের নিরাপত্তা সংকট থেকেই যাচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অধিক প্রয়োজন।

সারাদেশে সরকারী হাসপাতালে ওয়ানস্টপ চালুর প্রত্যয় ব্যক্ত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জনকণ্ঠকে জানান, সরকারী বরাদ্দের শতভাগ ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহসহ নামমাত্র ফিতে সব পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকায় এখানে রোগীর চাপ বাড়ছে দিন দিন। এছাড়া প্রয়োজন নেই এমন রোগীরাও ভর্তি হয়ে সরাসরি ওয়ার্ডে চলে আসায় চাপ বাড়ছে। ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু হলে এসব রোগী ভর্তি হওয়ার চাপ কমে আসবে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু থাকলে কর্তব্যরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যেসব রোগী ভর্তির প্রয়োজন মনে করবেন কেবল তাদেরই ওয়ার্ডে পাঠাবেন। আর যাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া যায় তাদের আর ওয়ার্ডে পাঠানো হবে না। এতে রোগীদের ভোগান্তিসহ চিকিৎসা ব্যয় যেমন সাশ্রয় হবে, তেমনই ব্যয়সহ চাপ কমে আসবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। অনিয়ম প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার মান এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত। মানসম্পন্ন সেবার মান ধরে রাখতে কোন অনিয়ম ও অবহেলা সহ্য করা হবে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো ও সেবাদানের বিষয়টি বিদেশী অত্যাধুনিক হাসপাতালের সঙ্গে তুলনা করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ জনকণ্ঠকে জানান, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ওয়ানস্টপ সার্ভিস ও অবকাঠামোসহ চিকিৎসাদানের বিভিন্ন পদ্ধতি দেখে আমি অভিভূত হয়েছি। আমি অন্যান্য সরকারী হাসপাতালের পরিচালকদের ইতোমধ্যে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবা দেখে আসার পরামর্শ দিয়েছি। এই হাসপাতালের ওয়ানস্টপ সার্ভিস বন্ধ করে দিতে যেকোন চক্রের অপচেষ্টা প্রতিরোধ করা হবে। এই সেবা অব্যাহত রাখতে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৯ নবেম্বর থেকে চালু হওয়া এই ওয়ানস্টপ সার্ভিসে অর্থো সার্জারি, গাইনি, মেডিসিন, কার্ডিওলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ইকো কার্ডিওগ্রাম-ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাফি, ডিজিটাল এক্সরে, প্যাথলজি টেস্ট, ডে কেয়ার সেন্টার ও পর্যবেক্ষণ ওয়ার্ডের ২৪ ঘণ্টার চিকিৎসাসেবা প্রদানের সুবিধা রয়েছে। এসবের বাইরে জরুরি প্রসব সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের নরম্যাল ও সিজার প্রসবের ব্যবস্থাসহ সড়ক দুর্ঘটনায় কিংবা মারামারি সংঘর্ষে আহতদের অপারেশন করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এই ওয়ানস্টপ সার্ভিসে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, দেশের কোন সরকারী হাসপাতালে প্রথমবারের মত এই সার্ভিস চালু হওয়ায় হাসপাতালের অন্ত বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগী ভর্তির চাপ কমে আসতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রতিদিন গড়ে ১শ থেকে ২শ রোগী ভর্তির চাপ কমে গেছে। দিন দিন রোগী ভর্তির এই চাপ আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অবকাঠামো ও চিকিৎসেবায় আমূল পরিবর্তন এসেছে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের একটি অংশকে আলাদা করে চালু করা হয়েছে এই ওয়ানস্টপ সার্ভিস। জরুরী বিভাগে আসা রোগীদের কর্তব্যরত ইমারজেন্সি মেডিক্যাল অফিসার (ইএমও) দেখার পর গুরুতর রোগীদের ভর্তি করে সরাসরি ওয়ার্ডে পাঠাচ্ছেন। বাকিদের কাউকে ডে কেয়ার সেন্টার ও কাউকে পর্যবেক্ষণ ওয়ার্ডে পাঠাচ্ছেন। এই সময়ে রোগীদের জরুরী পরীক্ষার প্রয়োজনে এক্সরে, ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাফি ও প্যাথলজি ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় ধরে থাকার পর ডে কেয়ার সেন্টার ও পর্যবেক্ষণ ওয়ার্ড থেকে রোগীদের ছুটিও হচ্ছে, আবার ওয়ার্ডেও পাঠানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ এমএ আজিজ ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, এর সুফল পাচ্ছে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে হতদরিদ্র মানুষ। অথচ চিহ্নিত একটি মহল এই সুফল বন্ধের চক্রান্ত করায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাসহ স্থানীয় সচেতন মহলকে সতর্ক থেকে ওয়ানস্টপ সার্ভিস সচল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে রোগীরা এই সার্ভিস থেকে দৃশ্যমান সুবিধা পাওয়ায় কিছুদিন আগে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এক পত্রে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছিরউদ্দিন আহমদকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ময়মনসিংহ মেডিক্যালের এই ওয়ানস্টপ সার্ভিসের রোল মডেল দেশের সবকটি বড় সরকারী হাসপাতালে চালু করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পরিচালকদের নির্দেশ দিয়েছেন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহমদ জনকণ্ঠকে জানান, ঢাকার বাইরে দেশের কোন সরকারী হাসপাতালে এই প্রথম প্রাথমিক পর্যায়ের সকল সুবিধা নিয়ে চালু হয়েছে ওয়ানস্টপ সার্ভিস। পূর্ণাঙ্গ সুবিধার এই ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু হওয়ায় গত প্রায় এক মাসে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চাপ কমার পাশাপাশি রোগীদের ভোগান্তিও অনেকটা কমে আসতে শুরু করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন অনুকরণীয় উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন, বিএমএ ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ মতিউর রহমান ভুঁইয়া জানান, ওয়ানস্টপ সার্ভিসে মারামারি, দুর্ঘটনায় আহত ও প্রসূতিসহ যে কোন সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রয়োজন মনে করলেই কেবল কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রোগীকে ভর্তির জন্য হাসপাতালের ওয়ার্ডে পাঠাচ্ছেন। এতে করে ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ কমার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিও কমতে শুরু করছে বলে দাবি করেন এই চিকিৎসক নেতা। হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরাও রোগীদের স্বস্তির সাথে সেবা দিতে পারছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এক হাজার শয্যার ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গড়পরতা প্রতিদিন ২৬০০ থেকে ২৮০০ রোগী ভর্তি থাকে। এছাড়া হাসপাতালের জরুরী বিভাগে প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ এবং হাসপাতালের বহির্বিভাগে আরও প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এক হাজার শয্যার বিপরীতে চিকিৎসক ও নার্সসহ বিদ্যমান জনবল দিয়ে এত বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বদলে যাওয়ার গল্প আজ সারাদেশে। এই হাসপাতালের উন্নয়ন কার্যক্রম ও পরিচালনা এখন দেশব্যাপী সরকারী হাসপাতালগুলোর রোলমডেল।  হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার নাছির উদ্দীন সবার জন্য সুস্বাস্থ্য, সবার জন্য সুচিকিৎসা, এই মিশন ও ভিশনকে সামনে রেখে রোগীবান্ধব ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করেছেন।  এই সার্ভিস চালু হওয়ার এক বছরের মধ্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও আস্থা অর্জন করেছে। ফলে বাংলাদেশ

সরকার ইতিমধ্য দেশের সকল টারশিয়ারী ও জেলা হাসপাতালগুলোতে এই কার্যক্রম চালু করার উদ্যেগ নিয়েছেন। বাংলাদেশে ওয়ানস্টপ সার্ভিস পদ্ধতির সফল রূপকার  ব্রিগ্রেডিয়ার নাছির উদ্দীন বলেন, আমি চাই বাংলাদেশ সরকারের একবিংশ শতাব্দীর স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল রোগীবান্ধব হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে। আমি সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ডিজিটাল হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে আমার কিছু পরিকল্পনা সরকার বরাবর প্রেরণ করেছি। সরকার এই বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাসও পাওয়া গেছে। তবে চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধির ফলে ক্রমশ রোগীর চাপ বাড়ছে। তাদেরকে সুচিকিৎসা দিতে হলে হাসপাতালের আরো ১০০০ শয্যা বাড়াতে হবে, বাড়াতে হবে জনবলসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। এ বিষয়ে তিনি সরকারসহ এলাকার সবার আন্তরিক দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।