anindabangla

১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , রবিবার , ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ


উনবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদ যখন ইউরোপে এক ভয়াবহ দানবীয় রূপ ধারণ করে ঠিক সেই সময় কার্ল মার্কস অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার ‘উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব’- এ আমাদেরকে দেখিয়েছেন কিছু মানুষ কিভাবে সমাজের বেশিরভাগ মানুষকে শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। খুব সুক্ষ্ণভাবে লক্ষ না করলে সাদামাটা চোখে এই শোষণ আমাদের চোখে ধরা পড়ে না, কারণ এটি চলে তথাকথিত বৈধ প্রক্রিয়ায়, এবং অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায়। কিন্তু মার্কস তার এই তত্ত্বে স্পষ্ট হিসেব কষে, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে বুর্জোয়া পুঁজিপতিরা শ্রমিকের প্রাপ্যটুকু চুরি করে নিয়ে শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। অনিবার্য কারণেই মার্কস এই প্রক্রিয়াটিকে শোষণ বলেন নি, বরং প্রমাণাদিসহ স্পষ্ট করে বলেছেন- চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ।
মার্কস- এর ‘উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব’ (Surplus Value Theory)- এর জ্ঞান আমাদের খাকুক আর নাই থাকুক, আমরা সাদা চোখে কি দেখি? বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে যেসব শ্রমিকেরা কাজ করেন তারা কি এই পেশার মাধ্যমে তাদের ভাগ্য পাল্টাতে পারেন? বছরের পর বছর কাজ করেও, দশ বছর চাকরি করেও তাদের কারো কি ভাগ্য পাল্টায়? মোটেও পাল্টায় না, কারণ তারা যে পারিশ্রমিক পান সেটা তাদের মাসিক ভরণ-পোষণেই ব্যয় হয়, তাও ভালভাবে চলে না। যদি তারা এমন পারিশ্রমিক পেতেন যা দিয়ে ভরণ-পোষণের পর কিছু সঞ্চয় করা যায় তাহলেই সেই উদ্বৃত্তটুকু জমিয়ে জমিয়ে তাদের ভাগ্য পাল্টানোর সুযোগ হতো। কিন্তু বাস্তবে তারা যা পান তার সবটুকু দিয়েও তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। ফলে এদের ভাগ্য পরিবর্তনের কোন সুযোগ তৈরি হয় না। এদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বছরের পর বছর একই থাকে। অর্থনৈতিক অবস্থা অপরিবর্তনীয় থাকে এবং এই হত দরিদ্র শ্রমিক জীবনই এদের চূড়ান্ত নিয়তী। শোষণ আর বঞ্চনার এই চক্র উপলব্ধি করতে পেরেও জীবন ধারণের প্রয়োজনে শ্রমিকেরা তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য থাকে।
এবার আমরা অন্য পক্ষটির দিকে তাকাই। গার্মেন্টস মালিক, যিনি আজ একটা ফ্যক্টরির মালিক, তিনি বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দু’টোর মালিক হয়ে যান এবং এভাবে হতেই থাকেন। ভাগ্যের পরিবর্তন চক্রবৃদ্ধিহারে কার ঘটে সেটা আমরা খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। শিল্প মালিকের আর্থিক সামর্থ্যের এই দ্রুত পরিবর্তন কিভাবে হয়? এর সোজা উত্তর- শ্রমিকের প্রাপ্য থেকে শ্রমিককে বঞ্চিত করে, তার প্রাপ্য চুরি করে শিল্প মালিক চক্রবৃদ্ধি হারে তার সম্পদ বাড়িয়ে যান। আর এর সাথে যুক্ত থাকে রাষ্ট্রীয় আনুকুল্য। পুজিবাদী ব্যবস্থায় সমস্ত রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান সর্বদাই ধনিক শ্রেণীর পক্ষে। কারণ এখানে বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতেই থাকে রাষ্ট্রের কতৃত্ব। মার্কস এ কারণেই বলেছিলেন- রাষ্ট্র শোষণের হাতিয়ার। সে যাই হোক, এভাবেই আজকের বাংলাদেশে মাত্র বিশ ভাগ মানুষের দখলে আছে আশি ভাগ সম্পদ। এভাবেই এদেশের কিছু মানুষ সীমাহীন বিলাসী জীবন কাটায় আর প্রায় ৪০% মানুষ বাস করে দরিদ্র সীমার নিচে।
পুঁজিবাদী কাঠামোর রাষ্ট্র এবং সমাজের এই হলো গতানুগতিক চিত্র এবং চরিত্র। পুঁজিবাদী বাস্তবতার এই ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। সমাজ সম্পর্কে মার্কসীয় এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষন গত প্রায় একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। মার্কস যে প্রক্রিয়ায় এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছেন সেই প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে, অনেকের অনাগ্রহ আছে এবং ব্যাপারটির শুদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তাহলে করণীয় কি? এই প্রশ্নের মুখোমুখি পুঁজিবাদী পণ্ডিতেরা খুব গালভরা একটি ব্যবস্থার কথা বলেন যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো কল্যাণমূলক চরিত্র অর্জনকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। Welfare State বা কল্যাণমূলক রাষ্ট্র কাঠামোতে পুঁজিবাদী দানবকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটা ফর্মুলার কথা বলা হয়। পশ্চিমে, বিশেষ করে ইউরোপে, বর্তমানে এর প্রায়োগিক সুফলও দেখা যাচ্ছে। সেইসব সমাজেও বুর্জোয়া ধনিক শ্রেণী আছে, তবে একেবারে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয় এমন মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অর্থনৈতিক কাঠামোতে মুটামুটি একটা ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা আছে।
বাংলাদেশ, একটি নব্য স্বাধীন দেশ হিসেবে শুরু থেকেই কল্যানমূলক উদারনৈতিক গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত। সংবিধান থেকে শুরু করে সমস্ত রাজনৈতিক বিধি-বিধান তৈরির ক্ষেত্রে কাগজে কলমে রাষ্ট্রের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রাখার কথা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে বলা হয়। কিন্তু বাস্তবের বাংলাদেশ গত ৪২ বছরে কেমন আর্থ-সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছে তার চিত্র আমাদের কাছে স্পষ্ট। শ্রেণী ব্যবধান এবং বৈষম্য এতোটা প্রকট যে আমাদের অর্থনীতি কট্টর পুজিবাদী রূপ ধারণ করে আছে।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রের করণীয় কি ছিল? কল্যাণমূলক চরিত্র অর্জনের জন্য দরকার ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শোষণ প্রক্রিয়াকে লাগামহীন হতে না দেওয়া। শ্রমিক নীতি হওয়া উচিত ছিল আরো বেশি উদার। শিল্প মালিকের এতোটা পক্ষ নেবার কোন প্রয়োজন রাষ্ট্রের ছিল না। ব্যাক্তি মালিকানাধীন শিল্পের বিকাশ আমাদের মতো দরিদ্র দেশে এতো দ্রুতগতিতে আশা করা কিছুতেই উচিত হয়নি। অসংখ্য মানুষকে পিষে পোশাক শিল্পকে এতো উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার এমন তাড়াহুড়ার কি প্রয়োজন ছিল বা আছে? কল্যণধর্মী রাষ্ট্রতো এরকম চাইতে পারে না। শিল্পায়ন, দেশীয় উদ্যোগকে উৎসাহিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রধানতম উৎস ইত্যাদি সব উচ্চাভিলাসী অজুহাতে রাষ্ট্র ও সরকার বরাবর পোশাকশিল্প মালিকদের পক্ষে থেকেছে। আর এই সুযোগে শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের নায্য পাওনা থেকে তাদেরকে লাগামহীনভাবে বঞ্চিত করে নিজেদের মুনাফা বাড়িয়ে গেছে শত শত গুণ। এই হলো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বাস্তবতা।
পোশাক শিল্পের মালিকেরা পোশাক রপ্তানী করে যে মুনাফা অর্জন করেন সেখান থেকে যদি মাত্র ৫% মুনাফা তারা ছেড়ে দেন শ্রমিক কল্যাণে তাহলে কেমন হয়? শুধু এটুকুর মাধ্যমেই শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সব সুযোগ সুবিধা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে যে বর্তমানে শ্রমিকদের জীবনের যে কঠোর বাস্তবতা তা পুরোপুরি পাল্টে দেয়া সম্ভব। এই অল্প একটু ছাড়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশের গোটা শ্রমিক চিত্রটি পাল্টে যাবে। শিল্প মালিকেরা কি স্বেচ্ছায় সেটা করবেন? পৃথিবীর কোথাও, কোনকালেই বুর্জোয়ারা এমন কিছু করেছেন বলে কোন নজির নেই। ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়তো কিছু দৃষ্টান্ত থাকতে পারে, কিন্তু শ্রেণীগতভাবে সম্পদশালী মানুষেরা ইতিহাসের কোন কালেই এমন দৃষ্টান্ত রাখে নি। এটাই বুর্জোয়া শেণীচরিত্র। তাহলে করনীয় কি? করণীয় হলো রাষ্ট্র এ স্বপক্ষে যাবতীয় উদ্যোগ নেবে। রাষ্ট্র কোন পক্ষকে প্রয়োজনে বাধ্য করবে। রাষ্ট্রের সেই ক্ষমতা আছে। যদিও পুঁজিবাদী রাষ্ট্র বুর্জোয়া শ্রেণীর পকেট সংগঠন, তারপরও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের এমন ইতিবাচক সিদ্ধান্তের নজির আছে।
এরকম কোন উদ্যোগ ব্যাতীত, কাঠামোগত কোন পরিবর্তন ছাড়া, রাষ্ট্রীয় সাংগঠনিক উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা ব্যাতীত দরিদ্র মানুষের অমানবিক জীবন যাপন পদ্ধতির অবসান হবে না। একটি ভবন ধ্বসের পর কিছুদিন এসব নিয়ে হা-হুতাশ হবে, খবর আর আলোচনার নতুন ইস্যু তৈরি হবে, কিছু অশ্রুজল বিসর্জন হবে, শ্রমিকের পশুর মতো জীবন নিয়ে নানা ন্যাকামী হবে, দোষারোপের প্রতিযোগিতা চলবে, ভোটের রাজনীতি হবে এবং তারপর একসময় সব শান্ত হবে, আমরা সেসব আবারো বেমালুম ভুলে যাব। আরো একটি ভবনে আগুন না ধরলে, আরেকটি ভবন ধ্বসে না পড়লে এসব আর কখনোই আলোচনায় আসবে না। শ্রমিক থাকবে শ্রমিকের জায়গায়, শোষক থাকবে শোষকের জায়গায়, শোষণ থাকবে শোষণের মতো, কিংবা তার গতি আরো বাড়বে। আর আমরা, সাধারণ পঙ্গপাল, আবারো কোন নতুন ইস্যু নিয়ে মেতে উঠবো, মজে থাকব। মহান মে দিবস ২০১৩ সফল হোক।
লেখক: প্রয়াত প্রফেসর মোশারফ হোসেন, রাস্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, আনন্দমোহন কলেজ।





দেশ প্রপার্টিজ

করোনায় মানবিক সাহায্য দিন

রুমা বেকারী

করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্কীকরণ

নিত্যদিন বা উৎসবে,পছন্দের ফ্যাশন

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন

Top
Top