অনিন্দ্য আড্ডা ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি ব্যবস্থায় কুখ্যাত ‘ডোলা প্রথা’ এবং নিম্নবর্গের নারীর ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন: একটি ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধান।।

-শেখ অনিন্দ্য মিন্টু

প্রকাশ : ১৭-১০-২০২৬ ইং | নিউজটি দেখেছেনঃ ৫১০৪

দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিভিত্তিক সামন্ততান্ত্রিক ইতিহাসে জমিদার বা ভূস্বামীদের শাসন কেবল অর্থনৈতিক খাজনা আদায় বা ভূমি দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা প্রজাদের শ্রম ও সম্ভ্রমের ওপর এক নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই আধিপত্যের সবচেয়ে নৃশংস ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপটি পরিলক্ষিত হয় ‘ডোলা প্রথা’ (Dola Pratha)-এর মাধ্যমে, যা মধ্যযুগীয় ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক বিধান ‘দ্রোয়া দ্যু সিগন্যর’ (Droit du seigneur বা ‘প্রভুর অধিকার’) কিংবা ‘জুস প্রিমে নকটিস’ (Jus primae noctis বা ‘প্রথম রাত্রির অধিকার’)-এর ভারতীয় সংস্করণ হিসেবে চিহ্নিত। এই প্রথার অধীনে দলিত, শূদ্র বা ভূমিহীন দরিদ্র প্রজাদের ঘরে কোনো নববধূ বিবাহিত হয়ে এলে, স্বামীর ঘরে যাওয়ার পূর্বে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে স্থানীয় উচ্চবর্ণের জমিদার বা ভূস্বামীর প্রাসাদে প্রথম রাত্রি (ক্ষেত্রবিশেষে একাধিক রাত্রি) যাপন করতে হতো।
ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই জঘন্য প্রথাটি কেবল কতিপয় বিকৃতমনা জমিদারের ব্যক্তিগত স্বেচ্ছাচারিতা ছিল না; বরং এটি ছিল বর্ণবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজকাঠামোয় নিম্নবর্গের মানুষের আত্মমর্যাদা বা ‘ইজ্জত’ (Izzat) চূর্ণ করার এবং তাদের চিরস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক দাসত্বে আবদ্ধ রাখার একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হাতিয়ার। ভারতের বিহার (বিশেষত ভোজপুর, রোহতাস, বক্সার ও শাহাবাদ অঞ্চল) ও উত্তরপ্রদেশ থেকে শুরু করে তেলেঙ্গানার দেশমুখ প্রথা এবং অবিভক্ত বাংলার জমিদারি এলাকায় এই সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়ন ও দাসত্বের নানা আঞ্চলিক রূপের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
ডোলা প্রথার ব্যুৎপত্তি, স্বরূপ এবং ভৌগোলিক বিস্তার-
‘ডোলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘পালকি’ বা ‘ডুলি’-যা ঐতিহ্যগতভাবে গ্রামবাংলা ও উত্তর ভারতের গ্রামীণ সমাজে নববধূকে পিত্রালয় থেকে স্বামীর গৃহে বহন করে নিয়ে যাওয়ার বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় উচ্চবর্ণের জমিদাররা তাদের জমিদারি বা তালুকের অন্তর্গত রাস্তা দিয়ে নিম্নবর্গের প্রজাদের বিয়ের পালকি যাওয়ার সময় তা আটকাত এবং নববধূকে পালকি সমেত জমিদার বাড়িতে নামিয়ে রাখার নির্দেশ দিত। পালকি বা ‘ডোলা’ থেকে নববধূকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া হতো বলেই স্থানীয়ভাবে এই প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের প্রথাটি ‘ডোলা প্রথা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
ভৌগোলিক কেন্দ্র এবং বর্ণভিত্তিক সমীকরণ-
তথ্যগত ও প্রামাণ্য গবেষণার আলোকে ডোলা প্রথার সবচেয়ে প্রকট ও দীর্ঘস্থায়ী রূপটি নথিভুক্ত হয়েছে ভারতের বিহার রাজ্যের মগধ ও ভোজপুর অঞ্চলে (সাবেক শাহাবাদ জেলা, যা বর্তমানে ভোজপুর, রোহতাস, বক্সার ও কৈমুর জেলায় বিভক্ত), এবং এর পাশাপাশি আওরঙ্গবাদ, জেহানাবাদ, গয়া, উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চল ও নেপালের তরাই অঞ্চলে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রণবীর সামাদ্দার তাঁর State of Justice in India: Issues of Social Justice (২০০৯) এবং From Popular Movements to Rebellion (২০১৮) শীর্ষক গবেষণায় ভোজপুর ও রোহতাস জেলার গ্রামগুলোতে—বিশেষ করে ‘আনওয়া’ (Anwa) গ্রামের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ টেনে-দেখিয়েছেন কীভাবে উচ্চবর্ণের রাজপুত জমিদাররা তাদের ক্ষেতে কর্মরত দলিত ও ভূমিহীন শ্রমিকদের নববধূদের বিবাহের আচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই জমিদারের গৃহে রাত্রিযাপন করতে বাধ্য করত।
এই প্রথার আর্থ-সামাজিক ও বর্ণভিত্তিক কাঠামোটি গ্রামীণ ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট স্তরবিন্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বিহার ও সংলগ্ন অঞ্চলে ডোলা প্রথার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও নিপীড়ক ছিল মূলত উচ্চবর্ণের সামন্ত জমিদাররা, যাদের মধ্যে রাজপুত (যাদের স্থানীয়ভাবে ‘বাবু সাহেব’ বলা হতো) এবং ভূমিহার ব্রাহ্মণরা ছিল সর্বাধিক প্রভাবশালী। এছাড়া ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ জমিদাররাও এই সামন্ততান্ত্রিক শোষণ কাঠামোর অংশীদার ছিল। তাত্ত্বিক অরুণ সিনহা এবং পরবর্তীকালের গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চবর্ণের অনুপস্থিতিতে বা ক্ষমতার পালাবদলে মধ্যবর্তী কৃষক জাতিগোষ্ঠী-যেমন কুর্মি (Kurmi)-যখন নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে গ্রামীণ অর্থনীতির শীর্ষে উঠে আসে এবং নিজেদের ‘জমিদার’ বা ‘মালিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, তখন তারাও নিম্নবর্গের দলিতদের ওপর উচ্চবর্ণের জমিদারদের মতোই অভিন্ন বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক প্রথা চাপিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, এই প্রথার প্রত্যক্ষ শিকার ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকৃত তফসিলি জাতি (Scheduled Castes), মহাদলিত ও শূদ্র সম্প্রদায়। এদের মধ্যে চামার (Chamar), মুসাহার (Musahar), দুসাধ বা পাসওয়ান (Dusadh/Paswan), ধোবি (Dhobi), কাহার (Kahar - যারা ঐতিহ্যগতভাবে ডুলি বা পালকি বহন করত), পাসি (Pasi), ডোম (Dome) এবং লোহার সম্প্রদায়ের ভূমিহীন কৃষি-শ্রমিকরা ছিল প্রধান ভুক্তভোগী। তাছাড়া ডোলা প্রথা কেবল বিবাহের প্রথম রাত্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; উচ্চবর্ণের জমিদার ও তাদের পুত্র-লাঠিয়ালরা দলিত নারীদের ওপর নিপীড়ন চালানোকে নিজেদের জন্মগত বিশেষাধিকার মনে করত। দোল বা হোলি (Holi) উৎসবের মতো সামাজিক ও ধর্মীয় উপলক্ষগুলোতে জমিদার শ্রেণির পুরুষরা প্রকাশ্যে শূদ্র ও দলিত নারীদের হেনস্তা ও সম্ভ্রমহানি করত, যা তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে ‘প্রথাগত অধিকার’ হিসেবে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছিল।
শোষণের সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কলকব্জা: ‘শুচিতা’র দ্বিচারিতা এবং অর্থনৈতিক দাসত্ব-
ভারতীয় বর্ণপ্রথার (Caste System) অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ‘শুচিতা ও অশুচিতা’ (Purity and Pollution) এবং কঠোর অন্তর্বিবাহ (Endogamy), যেখানে দলিত বা অস্পৃশ্যদের ছায়া বা স্পর্শকেও উচ্চবর্ণের জন্য ‘অপবিত্র’ বলে গণ্য করা হতো। অথচ ডোলা প্রথার ক্ষেত্রে এক চরম তাত্ত্বিক ও আচরণগত স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়। যে উচ্চবর্ণের জমিদাররা দিনের বেলায় দলিত প্রজার হাতে জল গ্রহণ করত না বা তাদের বাড়ির সামনে খাটিয়ায় (Charpai) বসতে দিত না, সেই জমিদাররাই দলিত নববধূদের নিপীড়ন করার সময় ‘শুচি-অশুচি’র বিধান সম্পূর্ণ বিস্মৃত হতো।
নারীবাদী ইতিহাসবিদ উমা চক্রবর্তী এবং সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণার আলোকে এই স্ববিরোধিতার পেছনে গভীর আর্থ-সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ চিহ্নিত করা যায়। উচ্চবর্ণের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় নারীর ধারণাটি ‘আমাদের নারী’ বনাম ‘তাদের নারী’-এই দুই বিপরীত মেরুতে বিভক্ত ছিল। উচ্চবর্ণের নারীদের ‘বংশের পবিত্রতা’ রক্ষার নামে অন্তঃপুরে বা পর্দার আড়ালে অবরুদ্ধ করে রাখা হতো, কিন্তু দলিত ও ভূমিহীন পরিবারের নারীদের জীবিকার তাগিদে জমিদারের ক্ষেতে-খামারে, খাল-বিলে বা প্রকাশ্য রাস্তায় কাজ করতে হতো। ফলে উচ্চবর্ণের পুরুষরা এই শ্রমজীবী নারীদের নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করত। মুসাহার নারীদের লোকগীতিতে এই নিত্যদিনের নিপীড়নের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে-যেখানে এক কৃষকবধূ আক্ষেপ করে গাইছেন যে, ধান রোপণ করতে গেলে পাপী জমিদার এক হাতে মজুরি মাপে এবং অন্য হাতে অশালীন আচরণ করে, তবুও পেটের দায়ে তার স্বামী তাকে সেই জমিদারের ক্ষেতেই কাজ করতে যেতে বলে।
এর পাশাপাশি ডোলা প্রথার অন্যতম প্রধান মনস্তাত্ত্বিক লক্ষ্য ছিল দলিত সম্প্রদায়ের ‘ইজ্জত’ (Izzat) বা সম্ভ্রম হরণ এবং পুরুষতান্ত্রিক অসহায়ত্ব উৎপাদন করা। নববিবাহিত দলিত যুবক ও তার গোটা সম্প্রদায়কে এই বার্তা দেওয়া হতো যে, তাদের ঘর, পরিবার বা স্ত্রীর ওপর তাদের কোনো অধিকার নেই; তাদের নারীদের সম্ভ্রম সম্পূর্ণভাবে জমিদারের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামীণ ক্ষমতা-সম্পর্কে (Power relations) দলিত পুরুষদের চরম অসহায় করে তোলা হতো, যাতে তারা নিজেদের পরিবারের নারীদের মর্যাদা রক্ষা করতে না পেরে আজীবন হীনম্মন্যতা ও ভীতিতে নিমজ্জিত থাকে।

এই সামাজিক ও শারীরিক নিপীড়নকে টিকিয়ে রাখার মূল ভিত্তি ছিল চরম অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা, ‘বেগার’ প্রথা এবং মাদক-ঋণের ফাঁদ। দলিত প্রজাদের নিজস্ব কোনো জমি ছিল না; তাদের জমিদারের জমিতে বিনা মজুরিতে ‘বেগার’ (Begar বা বাধ্যতামূলক শ্রম) খাটতে হতো এবং তাদের পরিষ্কার কাপড় পরার কিংবা নিজেদের ঘরের সামনে খাটিয়ায় বসারও অনুমতি ছিল না। এমনকি ভূমিহার জমিদাররা মুসাহারদের অর্থ দিয়ে মদ তৈরি করাত, পুলিশকে সেই মদের ব্যবসার কমিশন দিয়ে হাত করে রাখত এবং নিজেরা মদ্যপান করতে এসে মুসাহার নারীদের ওপর নিপীড়ন চালাত। হাইবাসপুর (Haibaspur) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেখা যায়, ভূমিহারদের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুসাহার পুরুষরা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলে তাদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। আবার ১৯৯৪ সালে উত্তর বিহারের সমস্তিপুর জেলার এক গ্রামে ভূমিহারদের ক্ষেত থেকে সামান্য আলু চুরির অপবাদে ভুকলি দেবী (Bhukli Devi) নামের এক দলিত নারীকে জনসমক্ষে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও নিপীড়ন করা হয়-যা দলিত নারীর মাতৃত্বকে অপবিত্র হিসেবে চিহ্নিত করার এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্মকে অভিশপ্ত করার এক চরম উচ্চবর্ণীয় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন।
ধর্মীয় মিথের আড়ালে নিপীড়নের বৈধতা ও নিম্নবর্গের পাল্টা-স্মৃতি-
সামন্ত জমিদাররা তাদের অপরাধকে চিরস্থায়ী প্রথায় রূপান্তরিত করতে ধর্মীয় ও পৌরাণিক মিথের আশ্রয় নিত। কিন্তু দলিত ও শূদ্র জনগোষ্ঠী তাদের লোকগাঁথা ও মৌখিক ইতিহাসের (Oral History) মাধ্যমে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী মিথকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মাহথিন মাই’ এবং ‘দিনা-ভাদ্রি’র আখ্যান।
মাহথিন মাই (রাগমতি) উপাখ্যান: ব্রাহ্মণ্যবাদী মিথ বনাম দলিত ইতিহাস-
বিহারের ভোজপুর জেলার (সাবেক শাহাবাদ) বিহিয়া (Behea) অঞ্চলে অবস্থিত ‘মাহথিন মাই কা মন্দির’ (Mahteen Mai Temple) আজও ডোলা প্রথার এক জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই মন্দির ও ডোলা প্রথার উৎপত্তি ঘিরে উচ্চবর্ণের সংস্কৃতায়িত ভাষ্য এবং নিম্নবর্গের দলিত ভাষ্যের মধ্যে এক স্পষ্ট ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়।
সংস্কৃতায়িত বা উচ্চবর্ণের ভাষ্যমতে (Sanskritic Version), শাহাবাদের স্থানীয় সামন্ত রাজা বা জমিদার রণপাল সিং (Ranpal Singh) তার এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় রাগমতি (Ragmati) নামের এক নববধূর ডোলা (পালকি) আটকান এবং তার সম্ভ্রমহানি করেন; অন্য একটি প্রচলিত মতে, রাজা ডোলা দাবি করলে রাগমতির স্বামী ও সঙ্গীরা যুদ্ধ করে প্রাণ দেন। নিজের এই চরম অবমাননা সহ্য করতে না পেরে রাগমতি আত্মহত্যা বা সহমরণ (Sati) বরণ করেন, যা গোটা অঞ্চলে প্রবল জনরোষ ও উত্তেজনার সৃষ্টি করে। তখন শাস্তি ও গণবিদ্রোহ থেকে বাঁচতে জমিদার রণপাল সিং এক অলৌকিক গল্পের প্রচার করেন যে, তিনি রাগমতিকে স্পর্শ করার আগেই তার দেহ থেকে দিব্য জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয় এবং তিনি দেবী রূপে স্বর্গে আরোহণ করেন। এভাবে একজন নিপীড়িত ও আত্মঘাতী নারীকে ‘মাহথিন মাতা’ বা দেবী দুর্গার অবতার হিসেবে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে জমিদার নিজের অপরাধ আড়াল করে।
বিপরীতে, গবেষক মহেশ্বর (১৯৯৭) এবং শূদ্র ও দলিত সম্প্রদায়ের নিজস্ব স্মৃতিচারণা (Subaltern Version) রণপাল সিংয়ের এই অলৌকিকত্বের দাবিটিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। দলিত ভাষ্য অনুযায়ী, রণপাল সিং নিয়মিতভাবে দরিদ্র দলিত ও শূদ্র নারীদের ওপর নিপীড়ন চালাত এবং রাগমতির আত্মহত্যার পর জবাবদিহিতা এড়াতেই এই দেবীকরণের নাটক সাজানো হয়েছিল। পরবর্তীতে এই মাহথিন মাইয়ের মিথকেই ভোজপুরের জমিদাররা ডোলা প্রথার ঐতিহাসিক বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে এবং আরা (Arrah) অঞ্চলে যাতায়াতকারী অসংখ্য দলিত নারীর মনে নিপীড়নের এক স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করে।
দিনা-ভাদ্রি (Dina-Bhadri) লোকগাঁথা: কল্পনায় ও সংগ্রামে ডোলা প্রথার প্রতিরোধ-
বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও নেপালের তরাই অঞ্চলের মুসাহার সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ১৩টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত দীর্ঘ লোকগাঁথা বা পালাগান ‘দিনা-ভাদ্রি’তে ডোলা প্রথার বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রতিরোধের চিত্র ফুটে উঠেছে। এই গাঁথায় দেখা যায়, জমিদারদের লাঠিয়াল ও ভৃত্যরা রাস্তার মোড়ে বসে থাকত এবং কোনো দলিত নারী কূপ থেকে জল আনতে বা কাজের জন্য ঘর থেকে বের হলেই তাকে উত্ত্যক্ত করত, যার ফলে ভীতসন্ত্রস্ত পরিবারগুলো জমিদারের অন্যায় আদেশ মেনে নিতে বাধ্য হতো।
কাহিনীর চূড়ান্ত পর্বে দেখা যায়, দুই দলিত ভাই দিনা এবং ভাদ্রি বিবাহ শেষে তাদের নববধূদের ডোলা (পালকি) নিয়ে ফেরার পথে কানাউলি (Kanauli)-র পরাক্রমশালী রাজপুত জমিদার জোরাবর সিং (Jorabar Singh) তাদের পথ রোধ করে। গ্রামের প্রচলিত ‘ডোলা প্রথা’ অনুযায়ী নববধূদের প্রথম রাত্রি সবর্ণ জমিদারের প্রাসাদে কাটানোর বিধান জারি করে জোরাবর সিং পালকি বাহকদের ধমক দিয়ে বলে: "তোমরা কোথা থেকে আসছ, এই পালকি কোথায় যাবে? তোমাদের সামনে যেতে দেওয়া হবে না। ওহে প্রহরীরা, এই পালকি কানাউলিতে নামিয়ে নাও। কোন সাহসে কে তোমাদের আটকায়, তাকে আমার সামনে নিয়ে এসো।"। পরিবারের নারীদের পরামর্শে ও সমালোচনামূলক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দিনা ও ভাদ্রি এই প্রাচীন নিপীড়নমূলক প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং কানাউলিতে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অত্যাচারী রাজপুত জমিদার জোরাবর সিংকে হত্যা করে। পৌরাণিক উচ্চবর্ণের নায়করা যেখানে রাজকুমারীদের মর্যাদা ও রাজ্যের স্থিতাবস্থা রক্ষা করে, সেখানে দিনা-ভাদ্রির মতো নিম্নবর্গের লোকনায়করা বর্ণবাদ, বেগার প্রথা ও ডোলা প্রথার মতো সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমষ্টির মুক্তি নিশ্চিত করে।

ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে সমান্তরাল সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়ন: বাংলা ও তেলেঙ্গানা-
বিহার ও উত্তরপ্রদেশে যা ‘ডোলা প্রথা’ নামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে সামন্ত জমিদারদের অধীনে তা ভিন্ন নামে বা অলিখিত প্রথা হিসেবে সমানভাবে প্রচলিত ছিল।
প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশে রাজপুত, ভূমিহার, ব্রাহ্মণ এবং পরবর্তীতে ধনী কুর্মি জমিদাররা যেমন চামার, মুসাহার, দুসাধ, ধোবি, কাহার, পাসি ও ডোম সম্প্রদায়ের ভূমিহীন শ্রমিকদের ওপর ডোলা প্রথা ও বেগার প্রথা চাপিয়ে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি অবিভক্ত বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) এবং দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গানায় সামন্ত প্রভুদের দ্বারা প্রজাদের নববধূ ও নারীদের ওপর নিপীড়নের অভিন্ন চিত্র ইতিহাসে নথিভুক্ত রয়েছে।

অবিভক্ত বাংলার জমিদারি জুলুম: ‘জমীদার দর্পণ’ থেকে ময়মনসিংহের ‘টঙ্ক আন্দোলন’-
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-পরবর্তী জমিদারি প্রথায় দরিদ্র রায়ত ও নিম্নবর্গের কৃষক পরিবারের (হিন্দু ও মুসলিম উভয়ই) সুন্দরী স্ত্রী ও নববধূদের জমিদারের বজরা বা কাছারি বাড়িতে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া এবং প্রতিবাদ করলে মিথ্যা জরিমানা করার ঘটনা ছিল এক নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর পত্তনিদার ও সামন্ত জমিদাররা প্রজাদের ওপর যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভ করে, তার প্রামাণ্য চিত্র ফুটে উঠেছে ১৮৭২-৭৩ সালের সিরাজগঞ্জ কৃষক বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের কালজয়ী নাটক ‘জমীদার দর্পণ’ (১৮৭৩)-এ। নাট্যকার নিজে একটি জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তৎকালীন জমিদারদের মুখোশ উন্মোচন করে দেখিয়েছেন কীভাবে অত্যাচারী জমিদার হায়ওয়ান আলী তার মোসাহেব বাহিনীর সহায়তায় প্রজা দরিদ্র চাষী আবু মোল্লার সুন্দরী ও পতিব্রতা স্ত্রী নূরুন্নাহারকে নিজের লালসার শিকার বানানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সামন্ত জমিদাররা যে দরিদ্র প্রজার ঘরে সুন্দরী বধূ থাকাকে প্রজার ‘অযোগ্যতা’ এবং নিজেদের ভোগ্যবস্তু মনে করত, তা হায়ওয়ান আলীর সংলাপে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে-যেখানে সে ব্যঙ্গ করে বলে, "চাষার হাতে গোলাপ ফুল" এবং "পাকা আম দাঁড়কাকে খায়"। কুটনি কৃষ্ণমণির মাধ্যমে কুপ্রস্তাব পাঠিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর, জমিদার হায়ওয়ান আলী নিরপরাধ আবু মোল্লাকে ধরে এনে বিনা কারণে ৫০ টাকা জরিমানা করে এবং পরবর্তীতে নূরুন্নাহারকে জোরপূর্বক ধরে এনে চরম নিপীড়ন চালায়, যার ফলে নূরুন্নাহারের করুণ মৃত্যু ঘটে। নিপীড়নের প্রাক্কালে নূরুন্নাহারের আর্তনাদ-"আপনি সব ক'র্ত্তে পারেন। আমি আপনার প্রজা, আমি আপনার মেয়ে, আপনি আমার বাপ... ছেড়ে দিন"-তৎকালীন বাংলার হাজারো দ্বৈত-দলিত (শোষিত প্রজার অধীনস্থ নারী) কৃষকবধূর অসহায়ত্ব ও প্রতিবাদের দলিল হয়ে আছে।
একইভাবে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তর সীমান্তে গারো পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলে (বর্তমান নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা অঞ্চল) সুসং ও স্থানীয় সামন্ত জমিদারদের অধীনে হাজং, গারো (মান্দি), কোচ, ডালু, বানাই ও রাজবংশী আদিবাসী কৃষকদের ওপর শোষণ চরম আকার ধারণ করেছিল।
১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদার ও সরকার হাজংদের বিনা পারিশ্রমিকে বনের হাতি ধরার ‘হাতি বেগার প্রথা’য় বাধ্য করে, যার বিরুদ্ধে মনা হাজং, গোরাচাঁদ হাজং ও বাঘা হাজং প্রমুখের নেতৃত্বে হাতিখেদা বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং ১৮৭৯ সালে তা নিষিদ্ধ হয়। এরপর জমিদাররা বেশি অর্থের লোভে ‘টঙ্ক প্রথা’ (ফসল হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান খাজনা দেওয়া; ১৯৩৭ সালে সোয়া একর জমির জন্য ১৫ মণ ধান ধার্য করা হয়) জারি করে। এই অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি জমিদারদের লাঠিয়াল এবং তাদের সহযোগী ব্রিটিশ পুলিশ ও মিলিটারি বাহিনী হাজং গ্রামের নারীদের ওপর নিপীড়ন চালাত।
১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি নেত্রকোণার দুর্গাপুরের বহেরাতলী গ্রামে সশস্ত্র পুলিশ ও মিলিটারি বাহিনী টঙ্ক আন্দোলনের কর্মী লংকেশ্বর হাজংয়ের নববিবাহিতা যুবতী স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে (যিনি আন্দোলনে নিজের পরিচয় পাল্টে ‘সরস্বতী’ নাম নিয়েছিলেন; মাত্র ১২ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল) জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। কুমুদিনীর সম্ভ্রম বাঁচাতে কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কৃষক সমিতির বিপ্লবী নেত্রী রাশিমণি হাজং হাজং ভাষায় গর্জে উঠে বলেন: "ময় তিমাদ, তিমৗদলৗ মান ময় রুক্ষা কুরিব না-তে মরিব, তুরা তুমলা নীতি নিয়ৗ বুইয়ৗ থাক" (অর্থাৎ, "আমি একজন নারী, নারী হয়ে নারীর মান রক্ষা করব না হয় মরব, তোমরা তোমাদের নীতি নিয়ে বসে থাকো")। রাশিমণি হাজং হাতে থাকা দা দিয়ে আঘাত করে কুমুদিনীকে অপহরণের হাত থেকে উদ্ধার করেন এবং একজন সৈন্যকে ধরাশায়ী করেন; পরবর্তীতে অপর এক সৈন্যের গুলিতে রাশিমণি হাজং ও সুরেন্দ্রনাথ শহীদ হন।
তেলেঙ্গানার ‘গাদি’ এবং ‘আদাবাপা’ (Adabapa) প্রথা-
দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদ রাজ্যে নিজামের শাসনামলে (আসফ জাহি আমল থেকে ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত) তেলেঙ্গানা অঞ্চলের রেড্ডি ও উচ্চবর্ণের সামন্ত প্রভু-যাদের ‘দোরা’ (Dora) বা ‘দেশমুখ’ (Deshmukh) বলা হতো এবং তাদের সহযোগী নিয়োগী ব্রাহ্মণ ‘পাটোয়ারী’রা-মালা, মাদিগা ও চাকালি (ধোপা)-সহ অন্যান্য অস্পৃশ্য ও নিম্নবর্গের প্রজাদের ওপর চরম দাসত্বমূলক প্রথা চাপিয়ে দিয়েছিল। ব্রিটিশদের চাপে দোরারা যখন ক্যাস্টর ও চিনাবাদামের মতো বাণিজ্যিক ফসল চাষে ঝুঁকে পড়ে, তখন তারা অস্পৃশ্য ও নিম্নবর্ণের মানুষদের ‘ভেট্টি’ (Vetti বা বিনা মজুরির বেগার শ্রমিক) এবং ‘বাগেলা’ (Bhagela বা বংশানুক্রমিক ঋণদাস)-তে রূপান্তরিত করে। প্রজাদের দোরার সামনে এসে নতজানু হয়ে বলতে হতো: "আমি আপনার ক্রীতদাস, আমি আপনার পা চুম্বন করি"।
এই সামন্ত প্রভুদের দুর্গ-সদৃশ বাসস্থানকে বলা হতো ‘গাদি’ (Gadee), যেখানে দোরা তার পরিবারের পাশাপাশি অসংখ্য ‘আদাবাপা’ (Adabapa) এবং ‘দাসী’ ও তাদের সন্তানদের রাখত। ‘আদাবাপা’ ছিল ডোলা প্রথার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী এক নিষ্ঠুর প্রথা: এই প্রথা অনুযায়ী, জমিদার বা দোরার কন্যা যখন বিবাহিত হয়ে শ্বশুরবাড়িতে যেত, তখন যৌতুকের অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রামের নিম্নবর্ণের অবিবাহিত কিশোরী বা যুবতী মেয়েদের জোরপূর্বক ক্রীতদাসী হিসেবে তার সাথে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এই আদাবাপা নারীরা আজীবন জমিদারের মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গার্হস্থ্য শ্রম দেওয়ার পাশাপাশি সামন্ত প্রভুদের নিপীড়নের শিকার হতো।
১৯৪৫-৪৬ সালে ভিসনুরের নৃশংস দেশমুখ রামচন্দ্র রেড্ডির বিরুদ্ধে ধোপা সম্প্রদায়ের দরিদ্র নারী চাকালি (চিত্তিয়ালা) আইলাম্মার (Chakali Ailamma) ফসল ও মর্যাদা রক্ষার সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকেই ঐতিহাসিক তেলেঙ্গানা সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামের (১৯৪৬–১৯৫১) সূচনা হয়।
সশস্ত্র প্রতিরোধ, নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং ডোলা প্রথার অবসান-
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ডোলা প্রথা কোনো আইনি সংস্কার বা জমিদারদের সদিচ্ছায় বিলুপ্ত হয়নি; বরং ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে নিম্নবর্গের কৃষক ও দলিত নারীদের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই প্রথার কবর রচিত হয়।
কিষাণ সভা ও ভোজপুরের সশস্ত্র নকশাল আন্দোলন-
বিহারে জমিদারি উচ্ছেদ আইন ও ভূদান আন্দোলনের পরও যখন গ্রামীণ পর্যায়ে উচ্চবর্ণের রাজপুত ও ভূমিহারদের সামাজিক আধিপত্য অটুট ছিল, তখন ১৯৬০-এর দশকে ‘কিষাণ সভা’ (Kisan Sabhas)-র সক্রিয়তা পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে। মূলত মধ্যবর্তী ও অনগ্রসর কৃষক জাতিগোষ্ঠী-যেমন যাদব (Yadav), কুর্মি (Kurmi) এবং কোয়েরি (Koeri)-দের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই কিষাণ সভাগুলো অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি নারীর অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টিকে আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত করে এবং নারী কৃষি-শ্রমিকদের নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। আওরঙ্গবাদের মতো জেলাগুলোতে রাজপুত জমিদারদের বিরুদ্ধে দলিতদের প্রতিরোধ সংগ্রামে কোয়েরি ও যাদব সম্প্রদায়ের কৃষকরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়, যার ফলে অনেক এলাকায় প্রথাগত সামন্ততান্ত্রিক জুলুম হ্রাস পেতে শুরু করে।
তবে ডোলা প্রথার বিরুদ্ধে সবচেয়ে চূড়ান্ত ও মরণপণ আঘাতটি আসে ১৯৭০-এর দশকে ভোজপুর অঞ্চলে সূচিত সশস্ত্র নকশালবাড়ি আন্দোলনের (সিপিআই-এমএল লিবারেশন) মাধ্যমে। কল্যাণ মুখার্জি ও রাজেন্দ্র সিং যাদব (১৯৮২), অরুণ সিনহা (১৯৭৮), সুমন্ত ব্যানার্জি (১৯৮৪) এবং অরবিন্দ এন. দাস (১৯৮৩)-এর মতো গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোজপুরের এই বিদ্রোহ কেবল মজুরি বৃদ্ধির অর্থনৈতিক লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল নিম্নবর্গের মানুষের ‘ইজ্জত’ (সম্ভ্রম ও সামাজিক মর্যাদা) পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। ১৯৭০ সালের দিকে ভোজপুর জেলার সাহার ব্লকের অন্তর্গত ‘একওয়ারি’ (Ekwari) গ্রাম থেকে এই সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মাস্টার জগদীশ মাহাতো (Jagdish Mahto), রামেশ্বর আহির (Rameswar Ahir) এবং রামনরেশ দুসাধ (Ramnaresh Dusadh)। বিদ্রোহীরা ঘোষণা করেন যে, কোনো দলিত বা দরিদ্র নববধূর ডোলা আর জমিদার বাড়িতে যাবে না এবং যে জমিদার বা লাঠিয়াল দলিত নারীর সম্ভ্রমে আঘাত হানবে, তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। ১৯৭০-এর দশক জুড়ে এই ধারাবাহিক প্রতিরোধের ফলে ভোজপুর, রোহতাস ও বক্সার অঞ্চলে শতাব্দীপ্রাচীন ‘ডোলা প্রথা’ চিরতরে বিলুপ্ত হয়।
সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় গ্রামীণ বিহারে দলিত নারীদের এই সশস্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিরোধকে তিনটি আন্তঃসংযুক্ত পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে (১৯৭০-এর দশকের প্রারম্ভে) আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চবর্ণের সামন্ত জমিদারদের ‘সামাজিক পিতৃতন্ত্র’ (Societal Patriarchy)-অর্থাৎ ডোলা প্রথা ও ক্ষেতে-খামারে দলিত নারীদের ওপর প্রাত্যহিক নিপীড়ন-সশস্ত্রভাবে প্রতিহত করা।
দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৯৭৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত গণসংগ্রামের পর্বে) লড়াইটি কেবল জমিদারদের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং জমিদারদের রক্ষাকারী পুলিশ ও প্রশাসনের ‘রাষ্ট্রীয় পিতৃতন্ত্র’ (State Patriarchy)-এর বিরুদ্ধেও বিস্তৃত হয়; উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৮ সালে পারারিয়া (Pararia) গ্রামে পুলিশ বাহিনী যাদব সম্প্রদায়ের ২০টি পরিবারের নারীদের ওপর যে পাশবিক নির্যাতন চালায়, তা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নগ্ন রূপকে সামনে নিয়ে আসে এবং প্রতিরোধের মাত্রাকে তীব্রতর করে।
তৃতীয় পর্যায়ে (১৯৮৭-পরবর্তী সময়ে) শিলা (Shila), ‘লহরী’ (Lahari) এবং ‘অগ্নি’ (Agni)-র মতো তৃণমূল দলিত নারী কর্মীদের উত্থানের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিত নারী সংগঠন গড়ে ওঠে। এই পর্বে বীণা আগরওয়ালের (১৯৮৮) তত্ত্বানুযায়ী নারীরা কেবল নিপীড়ন থেকে মুক্তি নয়, বরং পুরুষের মাধ্যম ছাড়া সরাসরি ভূমির মালিকানার (Direct access to land rights) দাবি উত্থাপন করে, কারণ ভূমির ওপর প্রত্যক্ষ অধিকারই নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।
সামন্ত প্রভুদের পাল্টা আঘাত ও কাস্ট সেনা (Caste Senas)-র সহিংসতা-
ডোলা প্রথা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দলিতদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং ন্যূনতম মজুরির দাবিতে নিম্নবর্গের মানুষের মাথা তুলে দাঁড়ানোকে উচ্চবর্ণের ভূস্বামীরা তাদের শতাব্দীপ্রাচীন আধিপত্যের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে গ্রহণ করে। নিজেদের হারানো সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে রাজপুত, ভূমিহার এবং ধনী কুর্মি জমিদাররা একাধিক সশস্ত্র প্রাইভেট বাহিনী বা ‘কাস্ট সেনা’ গঠন করে-যার মধ্যে কুর্মিদের ‘ভূমি সেনা’ এবং ভূমিহার জমিদারদের ‘রণবীর সেনা’ (Ranvir Sena) ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর।
১৯৯০-এর দশকে রণবীর সেনা ভোজপুর ও জেহানাবাদ জেলায় দলিতদের ওপর যে সন্ত্রাস চালায়, সেখানে ‘ডোলা প্রথা’র সেই পুরনো আধিপত্যকামী মানসিকতাটি প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ও গণহত্যার রূপে ফিরে আসে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের বাথানি টোলা (Bathani Tola) এবং ১৯৯৭ সালের ১০ এপ্রিল একওয়ারি (Ekwari) হত্যাকাণ্ডে রণবীর সেনা স্থানীয় পুলিশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ধোবি, কাহার, চামার ও লোহার সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালায়। এই হামলাগুলোতে ১৫ বছর বয়সী প্রভা (যার দুই-তিন দিন পরেই স্বামীর ঘরে যাওয়ার কথা ছিল) এবং মানমতিয়াসহ অপ্রাপ্তবয়স্ক দলিত কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে রণবীর সেনা ৪০০-রও বেশি দলিত মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু এত নৃশংসতার পরও ১৯৯০-এর দশকে বিহারের রাজনীতিতে নিম্নবর্গ ও অনগ্রসর শ্রেণির রাজনৈতিক উত্থান এবং তৃণমূল প্রতিরোধের মুখে সামন্ত জমিদাররা তাদের পুরনো ‘ডোলা প্রথা’ বা প্রাতিষ্ঠানিক দাসত্ব আর কখনোই ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
উপসংহার-
সামন্ত জমিদারদের এলাকায় প্রচলিত ‘ডোলা প্রথা’ এবং বাংলার জমিদারি প্রথা বা তেলেঙ্গানার ‘আদাবাপা’ ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, প্রাক-আধুনিক ও ঔপনিবেশিক দক্ষিণ এশিয়ায় সামন্ততান্ত্রিক শোষণ কেবল উদ্বৃত্ত ফসল হরণের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না; এটি ছিল নিম্নবর্গের নারীর সম্ভ্রম ও স্বাধীনতার ওপর উচ্চবর্ণের প্রভুদের এক প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রাসন। একদিকে কঠোর বর্ণপ্রথার মাধ্যমে দলিতদের ‘অস্পৃশ্য’ করে রাখা এবং অন্যদিকে ‘ডোলা প্রথা’র মাধ্যমে তাদের নববধূদের ওপর নিপীড়ন চালানো-এই চরম দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে, বর্ণবাদী ‘শুচিতা’র ধারণাটি ছিল মূলত ক্ষমতা ও আধিপত্য বজায় রাখার একটি সুবিধাবাদী কৌশল। রাগমতি (মাহথিন মাই), নূরুন্নাহার, রাশিমণি হাজং, চাকালি আইলাম্মা এবং ভোজপুরের অগণিত নাম না জানা দলিত নারীর আত্মত্যাগ ও সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ সমাজ থেকে ডোলা প্রথার মতো জঘন্য সামন্ততান্ত্রিক প্রথার চিরতরে অবসান ঘটেছে।
-প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র (References)
১. Samaddar, Ranabir (2009). State of Justice in India: Issues of Social Justice. New Delhi: SAGE Publications India.
২. Samaddar, Ranabir, ed. (2018). From Popular Movements to Rebellion: The Naxalite Decade. London & New York: Routledge.
৩. Sinha, Arun (1978). "The Awakening in Bhojpur". In Samar Sen, Debabrata Panda, & Ashish Lahiri (Eds.), Naxalbari and After: A Frontier Anthology (Vol. 1, pp. 264–290). Calcutta: Kathashilpa.
৪. Mukherjee, Kalyan & Yadav, Rajendra Singh (1982). "For Reasons of State: Oppression and Resistance—A Study of Bhojpur Peasantry". The Journal of Peasant Studies.
৫. Kala, Manju; Maharaj, R. N.; & Mukherjee, Kalyan (1986). "Peasant Unrest in Bhojpur: A Survey". In A. R. Desai (Ed.), Agrarian Struggles in India After Independence (pp. 263–274). Oxford University Press.
৬. Das, Arvind N. (1983). "Agrarian Change from Above and Below: Bihar 1947–78". In Ranajit Guha (Ed.), Subaltern Studies II: Writings on South Asian History and Society (pp. 221–226). Oxford University Press.
৭. Banerjee, Sumanta (1984). India's Simmering Revolution: The Naxalite Uprising (pp. 301–305). London: Zed Books.
৮. Chakravarti, Uma (2001) & Srivastava. Violence and Dalit/Shudra Women's Resistance in Rural Bihar (citing Maheshwar, 1997 & Bina Agarwal, 1988).
৯. Human Rights Watch (1999). Broken People: Caste Violence Against India's "Untouchables" (Reports on Haibaspur, Bathani Tola, and 1997 Ekwari carnages in Bihar).
১০. Prakash, Brahma (2019). Cultural Labour: Conceptualizing the 'Folk Performance' in India. Oxford University Press; এবং 'God of Humans' Dina-Bhadri: Dalit Folktales and Environmental Movements.
১১. মীর মশাররফ হোসেন (১৮৭৩)। জমীদার দর্পণ (নাটক)। সিরাজগঞ্জ কৃষক বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত প্রামাণ্য সাহিত্যিক দলিল।
১২. দরজি আবদুল ওয়াহাব (১৯৮৯) ও সুবোধ সেনগুপ্ত সম্পাদিত (২০১৩)। ময়মনসিংহের চরিতাভিধান (পৃ. ৪৪১–৪৪২) এবং সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (প্রথম খণ্ড, পৃ. ৬৭২)—টঙ্ক আন্দোলন, রাশিমণি হাজং ও কুমুদিনী হাজংয়ের সংগ্রাম।
১৩. Telangana Peasant Struggle Archival Studies: Vetti, Bhagela and Adabapa Systems in Asaf Jahi Telangana এবং Chakali (Chityala) Ailamma in the Telangana Armed Peasant Struggle (1945–1951)।