সকল খবর ময়মনসিংহের খবর

লাল-সবুজে ভোর, স্মৃতিতে ৭১: ময়মনসিংহে বর্ণাঢ্য আয়োজনে মহান স্বাধীনতা দিবস

অনিন্দ্যবাংলা, ময়মনসিংহ, ২৬ মার্চ ২০২৬:

প্রকাশ : ২৬-৩-২০২৬ ইং | নিউজটি দেখেছেনঃ ৫১৫৪

কুচকাওয়াজ, সমাবেশ ও পুষ্পস্তবক অর্পণে শ্রদ্ধা; প্রটোকল বিতর্কে আলোচনা

ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই যেন অন্যরকম এক আবহে জেগে ওঠে ময়মনসিংহ। বাতাসে মিশে যায় দেশাত্মবোধের সুর, আকাশে উড়তে থাকে লাল-সবুজ পতাকা। প্রতিটি হৃদয়ে ফিরে আসে ১৯৭১-এর সেই রক্তঝরা স্মৃতি, ত্যাগ আর গৌরবের ইতিহাস। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আজ পুরো জেলা জুড়েই ছিল উৎসব, শ্রদ্ধা আর দায়িত্ববোধের এক অনন্য সমাবেশ।

সূর্যোদয়ে তোপধ্বনি, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা

দিনের সূচনা হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নগরীর পাটগুদাম জাতীয় স্মৃতিসৌধে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে। প্রতিটি তোপধ্বনি যেন স্মরণ করিয়ে দেয় সেইসব শহীদের কথা, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য।

এরপর শুরু হয় পুষ্পস্তবক অর্পণ। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে একে শ্রদ্ধা জানান বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। ফুলের প্রতিটি পাপড়ি যেন হয়ে ওঠে একেকটি কৃতজ্ঞতার ভাষা।

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা চোখ মুছতে মুছতে বলছিলেন,
“আমরা ভাবিনি স্বাধীনতা এতো সহজে টিকে থাকবে। এখন দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের; এই স্বাধীনতাকে ধরে রাখার।”

স্টেডিয়ামে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও কুচকাওয়াজ

সকালের প্রধান আকর্ষণ ছিল নগরীর রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামে আয়োজিত বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ। জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান।

মাঠজুড়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ পদচারণায় অংশ নেয় বাংলাদেশ পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, কারারক্ষী দল এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। তাদের নিখুঁত সমন্বয়, কণ্ঠে স্লোগান, পদচারণার ছন্দ; সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের প্রতীক।

শুধু বাহিনীই নয়, শিক্ষার্থীরাও ছিল সমানভাবে উজ্জ্বল। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিএনসিসি দল, স্কাউট এবং গার্লস গাইড সদস্যরা কুচকাওয়াজে অংশ নিয়ে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।

একজন স্কুলছাত্রী বলছিল,
“আজকে মার্চ পাস্টে অংশ নিতে পেরে আমি গর্বিত। মনে হচ্ছে আমিও দেশের জন্য কিছু করতে পারি।”

বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি ও বক্তব্য

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মিজ ফারাহ শাম্মী (এনডিসি), ডিআইজি মোহাম্মদ আতাউল কিবরিয়া, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার বলেন,
“স্বাধীনতা শুধু একটি অর্জন নয়, এটি একটি দায়িত্ব। ১৯৭১ সালের আত্মত্যাগ তখনই সফল হবে, যখন আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে পারব।”

তার বক্তব্যে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব।

আলোচনা সভা: ইতিহাস, ত্যাগ ও ভবিষ্যৎ

দুপুরে টাউন হল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। সেখানে বক্তারা ফিরে যান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতিতে।

একজন মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“আমরা বেতারে ঘোষণার শব্দ শুনেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। তখন কোনো ভয় ছিল না; ছিল শুধু দেশকে স্বাধীন করার এক অদম্য ইচ্ছা।”

বক্তারা বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন। তাই নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে হবে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।

সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ

দিনব্যাপী কর্মসূচিতে শুধু প্রশাসন বা কর্মকর্তা নয়; সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ এসেছে এই আয়োজন উপভোগ করতে।

শিশুরা হাতে পতাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছে, তরুণরা ছবি তুলছে, প্রবীণরা বসে গল্প করছেন; সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

একজন দর্শক বলেন,
“এই দিনটা আমাদের জন্য শুধু ছুটি নয়; এটা আমাদের অস্তিত্বের দিন।”

প্রটোকল বিতর্ক: আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া

তবে দিনের এই উৎসবমুখর আবহের মধ্যেই একটি বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হয় আলোচনা; পুষ্পস্তবক অর্পণের প্রটোকল।

অভিযোগ ওঠে, রাষ্ট্রীয় ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সি অনুযায়ী নির্ধারিত ক্রম পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নির্ধারিত ক্রম ভেঙে একাধিক ব্যক্তি একসঙ্গে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন,
“এখানে কোনো প্রটোকল ভঙ্গ হয়নি। আমরা সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে শ্রদ্ধা জানিয়েছি।”

অন্যদিকে ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া মন্তব্য করেন,
“রাষ্ট্রীয় প্রটোকল একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা; এটি অনুসরণ করা উচিত।”

এই ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে কিছু আলোচনা তৈরি হলেও সার্বিক আয়োজনের উপর এর প্রভাব খুব বেশি পড়েনি।

স্বাধীনতার চেতনা: অতীত থেকে বর্তমান

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি যুদ্ধ নয়; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের ফলেই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।

আজকের এই আয়োজন শুধু উদযাপন নয়; এটি একটি স্মরণ, একটি প্রতিজ্ঞা। প্রতিজ্ঞা যে, এই দেশকে আরও উন্নত, সমৃদ্ধ এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

স্মৃতি, গর্ব ও দায়িত্ব

ময়মনসিংহে মহান স্বাধীনতা দিবসের এই আয়োজন প্রমাণ করে; স্বাধীনতার চেতনা এখনও জীবন্ত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ছড়িয়ে পড়ছে নতুনভাবে।

লাল-সবুজ পতাকা শুধু একটি প্রতীক নয়; এটি একটি ইতিহাস, একটি সংগ্রাম, একটি স্বপ্ন।