হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব অষ্টমী স্নান উপলক্ষে ময়মনসিংহের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে আজ লাখো পুণ্যার্থীর ঢল নামে। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পাপমোচনের বাসনায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার পূণ্যার্থী নদীর জলে পুণ্যস্নানে অংশ নেন। নদীর দুই তীরে থানা ঘাট, কাচারি ঘাট, গুদারাঘাট এবং ওপারের শম্ভুগঞ্জ ঘাটে সকাল থেকে ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
প্রতি বছর এই পুণ্য লগ্নে ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান করলে পাপমোচন হয় বলে বিশ্বাস করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। নদীতে নামার আগে পূণ্যার্থীরা “হে ভগবান ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্র, আমার পাপহরণ কর” মন্ত্র উচ্চারণ করে ফুল, কলা, আম, ডাব ও হরতকি সমেত ভক্তিমন্ত্রের সঙ্গে স্নান সম্পন্ন করেন। নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ-সকলেই ভক্তিভরে নদীতে নামেন এবং জগতের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করেন।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন এবং স্নানোৎসব কমিটি পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে অস্থায়ী স্নানঘর, বিশ্রামাগার, প্রসাদ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছেন। এবারের স্নান উৎসবকে কেন্দ্র করে সিটি কর্পোরেশন ২৫টি স্থানে ৫০টি কাপড় পরিবর্তন বুথ, ৩০টি টিউবওয়েল ও ৩০টি টয়লেট স্থাপন করেছে। এছাড়া পুরো মেলা এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মন্দির কমিটি ও প্রশাসন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। ডুবুরি দল, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও সেনাবাহিনী সার্বক্ষণিক দায়িত্বে ছিলেন। চিলমারী উপজেলার ইউএনও মো. মাহমুদুল হাসান জানান, “অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প, নারী পুলিশ ও আনসার সদস্যদের মোতায়েনের ফলে এবারের স্নান উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”
অষ্টমী স্নানের সঙ্গে মিলিত হয়ে নদীর তীরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। ঘাটগুলোতে পুরোহিতের কাছে মন্ত্রপাঠের পর ভক্তরা নদীতে নামেন। নদীর ধারে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিন্নি-চিনির খেলনা, হস্তশিল্পজাত পণ্য এবং অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি হয়। পুণ্যার্থীরা স্নান শেষে মেলায় অংশগ্রহণ করে।
ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান শুধু ধর্মীয় নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। ময়মনসিংহ ও আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে আগত পুণ্যার্থীরা উৎসবের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এবারের অষ্টমী স্নান উৎসবে প্রায় তিন লাখ পূণ্যার্থী নদীতে নামেন। জেলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিদেশ থেকেও অংশগ্রহণকারীরা আসে। নদীর দুই তীরে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ঘাটগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
ময়মনসিংহ ছাড়াও কুড়িগ্রামের চিলমারী, নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ, রংপুরের তাজহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় অষ্টমী স্নান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। চিলমারীতে প্রায় চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং সেখানেও প্রায় তিন লাখ পুণ্যার্থী অংশগ্রহণ করেন।
দূর্গাবাড়ি মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক শংকর সাহা জানান, এবারের স্নান উৎসব সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১,১০০ সদস্য, প্রশাসনের ৬০০ জন, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় দলের আরও ২৫০ জন সদস্য দায়িত্বে ছিলেন।
মহাঅষ্টমী স্নান উৎসব ময়মনসিংহ ও ব্রহ্মপুত্র নদে ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব, ভক্তি ও পাপমোচনের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর এই ধারা অব্যাহত থাকে এবং সনাতন ধর্মের প্রতি ভক্তদের অটুট বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।